মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করেছে। তবে এর পর কী হবে, সেটি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তাই বিষয়টি নিয়ে এখনই সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে আসা দরকার। একই সঙ্গে ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। সেই পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং যেসব সুবিধা পাওয়া যাবে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে হবে। রাজধানীর গুলশান ক্লাবে গতকাল বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা। ‘বাংলাদেশের রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক: পাল্টা কৌশল ও আলোচনার ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা’ শীর্ষক এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। এ সময় মূল ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ। বৈঠকে আরো অংশগ্রহণ করেন বিজিএমইএর প্রশাসক আনোয়ার হোসেন, বিপিজিএমইএর সভাপতি শামিম আহমেদ প্রমুখ।
গোলটেবিল বৈঠকে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘ট্রাম্প ৯০ দিনের জন্য রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ স্থগিত করায় প্রাথমিকভাবে একে স্বাগত জানাই। তবে এ নিয়ে আমরা চিন্তিত, কারণ ৯০ দিন পর কী হবে তা জানি না। তাই আমাদের কী করা দরকার, কোন জায়গায় কী সুযোগ নিতে পারি, ট্রাম্প প্রশাসনকে কী প্রস্তাব দেয়া যায়—এসব বিষয় আলোচনা করে ঠিক করতে হবে। বিশেষ করে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনকে সামনে রেখে কী করা দরকার সেটি নিয়ে আলোচনা দরকার। আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা নেব, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের থেকে তৈরি পোশাক নেবে—এমন একটি সমঝোতায় আসা যেতে পারে।’ এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনই স্পষ্ট আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য এগিয়ে নিতে না পারলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও জানান এ ব্যবসায়ী নেতা।
যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে শুল্কারোপ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘মার্কিন প্রশাসন ৯০ দিনের পর কী করবে, তা নিয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তাই এখনই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে। সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে কী কী প্রস্তাব দিতে পারি, তা বিশ্লেষণ করতে হবে।’
রফতানি বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য কিছু কৌশলগত প্রস্তাব করা জরুরি। এতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ কমতে পারে। এ ট্যারিফের ফলে আমাদের খাতভিত্তিক প্রভাব কী হবে, কী কী পয়েন্টে আলোচনা করব, এ থেকে উত্তরণের পথগুলো কী হবে এ বিষয়ে কৌশল ঠিক করতে হবে। ইউএস রিটেইলারদের সঙ্গে বাড়তি খরচ ভাগ করে নেয়ার জন্য আলোচনা শুরু করতে হবে।’
শুধু কূটনৈতিক আলোচনার ওপর নির্ভর না করে বাজারভিত্তিক সমাধান খোঁজার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এজন্য ব্র্যান্ড ও বায়ারদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে খাতভিত্তিক এ শুল্কের প্রভাব বিশ্লেষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন মাসরুর রিয়াজ।
অনুষ্ঠানে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তুলার দাম একটি বড় বিষয়। সে হিসেবে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের বাজারের জন্য তাদের কাছ থেকে বড় আমদানির প্রস্তুতি নেয়া যেতে পারে। কিন্তু এটা বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির জন্য চিন্তা করলে টেকসই হবে না।’
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ যদি এখনই সক্রিয় না হয়, তাহলে তিন মাস পর যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারো উচ্চ শুল্ক কার্যকর হলে তাহলে রফতানিতে ধস নামতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে যৌথ ও সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেয়ার বিকল্প নেই। বিশেষ করে শুল্ক-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরো শক্তিশালী ও ন্যায়সংগত বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ছিল বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের সবচেয়ে বড় গন্তব্য, যা মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ। এ খাতে রফতানি আয় হয়েছে ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।